বিশ্বের কনিষ্ঠতম প্রধান শিক্ষক বাবর আলী

28th April 2020 District
বিশ্বের কনিষ্ঠতম প্রধান শিক্ষক বাবর আলী


মোঃ মনিরুল ইসলাম:::

সাদামাঠা গড়নের সোয়েটার পরিহিত একদম সাধারণ পরিবারের অতি সাধারণ চেহারার মিতভাষি  অল্পবয়স্ক একজন মানুষের পাশে বসে সেদিন রাতে বেশ কিছু ক্ষণ গল্প করার সুযোগ হয়েছিল! সত্যিই সাধারণ একজন 'এইতো সেদিনের' মানুষ! বয়স বেশি হয়নি, তাই 'অনভিজ্ঞ'! অনভিজ্ঞ ই বটে নাহলে মাত্র নয় বছর বয়সে দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকা পরিবার গুলোর দোরে দোরে বিনিপয়সায় শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার মতো পবিত্র ব্রত পালন করার দুঃসাহস হয় কি করে?

আমার নতুন পদে যোগদান করা তখন মেরেকেটে দুই কি আড়াই মাস হতো! প্রথম প্রথম বেশ কিছুটা বোঝাবুঝির ব্যস্ততায় এখানে সেখানে ছোটাছুটি র কারণে আমার সঙ্গে কিছুতেই যোগাযোগ করতে পারছিলনা 'আলোর দিশা পাবলিক স্কুল' এর মোঃ তোয়াব আলী! অবশেষে আমার অফিসে এসে একদিন একটা আমন্ত্রণ পত্র দিয়ে বললো," স্যার,অবশ্যই আসতে হবে! বাবর আলী কে এই অনুষ্ঠানে সম্বর্ধিত করা হবে!" 

এড়িয়ে যাওয়ার পরোক্ষ ভাষা ব্যবহার করেছিলাম সেদিন! বলেছিলাম চেষ্টা করবো! কারণ বেসরকারি বাংলা মিডিয়াম কিছু আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকার পোষিত সরকারের বেতনভুক্ত কিছু শিক্ষকের অবৈধ 'দহরম মহরম' এর বিরোধিতায় কয়েক কারবালা লড়তে হয়েছে আমাকে আমার আগের কর্মস্থলের এলাকায়! তাই আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অতিথি হতে মন চায়নি! কিন্তু তোয়াব ভাই এর আন্তরিকতা আর -- "কি করবো স্যার? চাকরি বাকরির পরীক্ষাও তো হচ্ছেনা! অত টাকা পাবো কোথায় ? তাই স্কুল খুলেছি "-- বার বার মনে পড়ছিলো! তাই অবশেষে ২৪শে নভেম্বর রাতে আমার সহকর্মী রাসেদুল কে নিয়ে সন্ধ্যায় মালদা থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম ফারাক্কা থানার ইমামনগর!

একদম নির্ধারিত সময়ের আগেই উপস্থিত হওয়া বিবিসি ঘোষিত পৃথিবীর কনিষ্ঠতম হেডমাষ্টার বাবর আলীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন তোয়াব ভাই! একদম সরল মনের নিপাট একজন ভদ্র মানুষ! ভারতবর্ষের বড় বড় তারকাদের সাথে একসঙ্গে স্টেজ্ শেয়ার করা এই মানুষটির সঙ্গে সাক্ষাতে আর কথাবার্তায় অহংবোধের 'অ আ ক খ' এর বিন্দুমাত্র লেশ টুকুও চেষ্টা করেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল! স্বল্প সময়ের আলাপচারিতায় জেনেছিলাম তাঁর The World's Youngest Headmaster হওয়ার আপবীতি! 

মাত্র ন'বছর বয়সেই গ্রাম থেকে বেশ অনেকটা দুরের স্কুল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার কাশিমবাজার গোবিন্দ সুন্দরী হাই স্কুলে পড়তে শুরু করেই স্কুল থেকে ফিরে আসার সময় গ্রামের অনেক ছোট ছোট বাচ্চাদের স্কুল না গিয়ে দারিদ্র্যের তাড়নায় কাগজ কুড়োতে যাওয়ার কথা বাবর আলীকে ভাবিত করেছিলো! তাই শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা জাগে! তাই ছোট্ট বাবর স্কুল থেকে ফেরার পর প্রতিদিন বিকেলে খেলার ছলে শখ করে শুরু করেন নিজের বোন সহ অন্যান্য ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে কলমে পড়ানোর কাজ! তার বাড়ির ঠিক পেছনের উঠোনে! আস্তে আস্তে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চলে শিক্ষার প্রসার! অনেকেই 'মুচকি' হাসে 'ঐটুকু' ছেলের শিক্ষা প্রসারের এই প্রচেষ্টায়! হাসিই তো আসার কথা! হাসি ছাড়া আর কিইবা আসতো! দু'বেলা দু'মুঠো খাবার নিশ্চিত করতে যদি শহরে গিয়ে কাগজ কুড়োতে হয় উস্কো খুস্কো ইয়েমেনমুখি ক্ষুধার্ত ছোট ছোট বাচ্চাদের, স্কুল পাঠানোর কথা শুনলে তো বাপ মায়ের মনের কষ্ট একটুখানি হাসার চেষ্টা করবেই! পেটের ক্ষুধা থাকলে শিক্ষাটা যে অনেকটাই লাক্সারি! 

কাজী নজরুল ইসলামের সেই কৈফিয়তী লাইনগুলো বড়োই প্রাসঙ্গিক --" ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চাই দুটো ভাত, একটু নুন/বেলা বয়ে যায়, খায়নি 'ক বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন!"

লোকের মুচকি হাসিতে বাবর আলীর অদম্য ইচ্ছা অবদমিত হয়ে যায়নি, যেমনটা আমাদের অনেকের ই প্রায়শই হয়ে থাকে! কারো একটা বক্র হাসিতে বা ভ্রু-কুঞ্চনেই  ঈপ্সিত বহু কর্মের অকাল প্রয়াণ ঘটে আর সমাধিস্থ হয়ে যায় বহু স্বপ্ন  কফিন বন্দী হয়ে! বাবর আলীর প্রচেষ্টা চলেছে নিরন্তর! তাঁর অবৈতনিক শিক্ষা দানের পরিসর যেমন যেমন বেড়েছে, গরীবের শিক্ষা গ্রহণের ক্রমবর্ধমান ইচ্ছাকেও আর দমিয়ে রাখা যায়নি! উত্তোরত্তর বৃদ্ধি ঘটেছে পড়ুয়াদের সংখ্যা! বাবর আলী নজর কেড়েছে সবার! নিজের লেখাপড়ার সাথে সাথে চলেছে তার হেডমাষ্টারি! জাতির নজর কেড়েছে! রচিত হয়েছে The World's Youngest Headmaster এর ইতিহাস! মাত্র ১৬ বছর বয়সেই বি বি সি এই খেতাবে ভূষিত করেছে বাবর আলিকে! সালটা ২০০৯! ভারতীয় বিভিন্ন বৈদ্যুতিন চ্যানেল 'রিয়াল ইন্ডিয়ান হীরো' ইত্যাদি সমজাতীয় সম্মানে ভূষিত করেছে আনন্দ শিক্ষা নিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মোঃ বাবর আলীকে! 

সেদিন বাবর ভাই এর মুখেই শুনেছিলাম ইতিমধ্যেই ইংরেজিতে মাষ্টার্স কম্প্লিট করেছেন! বিভিন্ন রাজ্য থেকেও বাবর আলী মডেলের স্কুল খোলা হচ্ছে! ডাক এসেছে বাবর আলীর! তাঁর কর্মপদ্ধতি এবং এই নিঃস্বার্থ মানবসেবায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বহু দেশি বিদেশি বহুজাতিক সংস্থা! আজ 'আনন্দ শিক্ষা নিকেতন' এর পরিসর বেড়েছে! আজ প্রান্তিক ক্ষুধাতুর শিশুদের পেটে "দু'মুঠো ভাত একটু নুন"ও পড়ছে! আর শিক্ষার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সমস্ত রকম সরকারি পরিসেবা প্রদান করে চলেছে বাবর আলীর 'আনন্দ শিক্ষা নিকেতন!' বাড়ি করে এসেছে সদিচ্ছার জয়, প্রচেষ্টার জয়! স্বামী বিবেকানন্দের মানবসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ এই বাবর আলীর The World's Youngest Headmaster হওয়ার এই রেকর্ড বহুদিন আগে লেখা আমাদের মিলেনিয়াম স্টার অমিতাভ বচ্চনের স্বর্গীয় বাবা শ্রী হরিভনস্ রায় বচ্চনের একটি হিন্দি কবিতার কয়েকটি লাইন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে :

লেহরোঁ সে ডর্ কর্ নৌকা কভি পার নেহি হোতি
কৌশিশ করনে ওয়ালোঁ কি কভি হার নেহি হোতি!
নান্হি চিঁটি জব দানা লেকে চলতি হে
চড়তি দিবারোঁ পর্ শও বার ফিসলতিহে 
মন্ কা বিশওয়াস্ রগোঁ মে শ্বাস ভরতা হে
চড়কর্ গিরনা, গিরকর চড়না, না অখড়তাহে
আখির উসকি মেহনত্ বেকার নেহি জাতি
কৌশিশ করনে ওয়ালোঁ কি কভি হার নেহি হোতি!

----------- মোঃ মোনিরুল ইসলাম নাদিম
             সুজাপুর, মালদা





Others News

ফারাক্কার বেনিয়াগ্রাম সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতির নিজস্ব ভবনের উদ্বোধন

ফারাক্কার বেনিয়াগ্রাম সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতির নিজস্ব ভবনের উদ্বোধন


সমবায়ের ওপর কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে সিঁদুরে মেঘ দেখছে রাজ্যের শাসকদল,তার ফলস্বরূপ দলীয় কর্মীদের পথে নামিয়ে আন্দোলন করে রাজনৈতিক সুবিধা তুলতে মরিয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।বাম আমলে সমবায়ের তেমন উন্নতি সাধন না হলেও বর্তমান সরকার ঢেলে সাজিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণদান, কৃষক বন্ধু চেক প্রদান, কিষান ক্রেডিট কার্ড, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের স্বনির্ভর করা, প্রভৃতি প্রকল্পের কাজ রাজ্য সরকার করে চলেছে,তারই ধারাবাহিকতায় নতুন সংযোজন ফারাক্কার বেনিয়াগ্রাম  সমবায় কৃষি উন্নয়ন  সমিতির নিজস্ব ভবন উদ্বোধন, উপস্থিত ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলা কেন্দ্রীয় কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের ফারাক্কা শাখার সুপারভাইজার মোঃ জিয়াউর রহমান,আইসি ফারাক্কা জয়দেব ঘোষ, সমাজসেবী সোমেন পান্ডে সহ এলাকার আপামর জনসাধারণ, সুপারভাইজার বলেন রাজ্য সরকারের সহায়তায় সমবায়ের মাধ্যমে সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মহিলাদের ও কৃষকদের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই সমবায়, কৃষক স্বনির্ভর হলেই দেশ এগিয়ে যাবে এটাই হচ্ছে সমবায়ের মুল লক্ষ্য, আইসি সমবায়ের শুভকামনা করেন ও মাস্কের ব্যবহার করার গুরুত্ব আরোপ করেন, সমবায়ের উন্নতি সাধনে  সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন।